johardiary.com

পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাঁওতালি সাহিত্যিক রবিলাল টুডুর প্রয়াণে শোকের ছায়া // রবিলাল টুডু

rabilaltudu-robilaltudu

নিজস্ব সংবাদদাতা:
সাঁওতালি সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহিত্যিক, নাট্যকার ও অলচিকি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ রবিলাল টুডু দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ থাকার পর আজ সকালে বারাসাতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সাঁওতালি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হল বলে মনে করছেন সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

রবিলাল টুডুর জন্ম ১৯৪৯ সালের ২১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা থানার অন্তর্গত নোয়াড়া গ্রামে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্রীয় সরকারের অডিটর জেনারেল হিসাবে। যদিও তিনি সেই চাকরি বেশীদিন করেননি। সেখান থেকে অবসর নিয়ে তিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে যোগ দেন।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি নাটক, একাঙ্ক নাটক, বেতার নাটক ও প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমে সাঁওতাল সমাজের নানা সমস্যা, দাবি-দাওয়া, প্রতিবাদ ও সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। অশিক্ষা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে তিনি তাঁর নাটকের বিষয়বস্তু করেছেন। একই সঙ্গে সমাজ পরিবর্তনের পথও দেখানোর চেষ্টা করেছেন তাঁর লেখনীতে। সাঁওতাল সমাজে যাত্রা ও নাটকের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নাট্যরচনার পাশাপাশি তিনি অলচিকি আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ ও সাহিত্যকর্ম ‘তেতরে’, ‘পছিমবাংলা’, ‘কুহু’, ‘সিগীর সাকওয়া’ এবং ‘বিদি সুতীম’-সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ভাষা ও সাহিত্য বিকাশমূলক নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।

রবিলাল টুডুর রচিত একমাত্র প্রকাশিত নাট্যগ্রন্থ “বীর বিরসা”, যা ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকগুলির মধ্যে রয়েছে— “সমাজ বাইরী” (১৯৭৪), “সারদি সেঁগেল” (১৯৭৫), “মুরুখ জ্বালা” (১৯৭৬), “দুলীড় বাণুঃ” (১৯৭৭), “কাঁহিশ” (১৯৭৮) এবং “ঞুতৌত সাঁওতা” (১৯৭৯)।

বেতার নাট্যকার হিসেবেও তিনি সমানভাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বেতার নাটকগুলির মধ্যে রয়েছে “সমবারি”, “কুকমু”, “দুলৌড়” এবং “রুতুচ মুরলী”। এই নাটকগুলি আকাশবাণী কলকাতার সাঁওতালি অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত হয়েছিল। তিনি নিজেও একজন দক্ষ বেতার অভিনেতা ছিলেন।
রবিলালবাবুর শেষ স্বপ্ন ছিল সাঁওতালী ভাষার লিপি আবিষ্কর্তা পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মুসিধু-কানহুর পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন। রবিলাল বাবু নিজের উদ্যোগেই গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন প্রায় দু-কাঠা জমিতে ঐ তিন মূর্তি তৈরিতে প্রায় পাঁচ লক্ষ ও ভবন নির্মাণে প্রায় দশ লক্ষ টাকা খরচ করেছিলে তার শেষ স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন।

সাঁওতালি ভাষা, সাহিত্যসংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক সম্মানে ভূষিত হন। ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারেরসারদাপ্রসাদ কিস্কু অ্যাওয়ার্ড’, ২০১৫ সালে ‘সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার’, ২০২২ সালে ‘বঙ্গভূষণ’ এবং ২০২৬ সালে ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ লাভ করেন।

এছাড়াও তাঁর বিখ্যাত নাটক “বীর বিরসা”-র জন্য ১৯৮৪ সালে জামশেদপুরের সারজমদাঃ বিরসী মেমোরিয়াল সোসাইটির পক্ষ থেকে তাঁকে ‘পণ্ডিত রঘুনাথ মুরমু স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।

রবিলাল টুডুর প্রয়াণে সাঁওতালি সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে এক যুগের অবসান ঘটল। তাঁর সাহিত্যকর্ম, নাট্যচিন্তা ও সমাজজাগরণের বার্তা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

#রবিলাল টুডু নিউজ
#সানতালি নিউজ
#সাঁওতালি নিউজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top